লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কম হলেও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না লবণচাষীরা

চলতি বছর দেশে লবণ উৎপাদন হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় পাঁচ লাখ টন কম। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকলে দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কথা অথচ ঘটেছে উল্টোটা।

চলতি বছর দেশে লবণ উৎপাদন হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় পাঁচ লাখ টন কম। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকলে দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কথা অথচ ঘটেছে উল্টোটা। ফলে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না চাষীরা। অভিযোগ রয়েছে, শিল্প সুবিধায় আমদানি করা সোডিয়াম সালফেটসহ বাণিজ্যিক লবণ অবাধে সরবরাহ করায় বাজারে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। ফলে ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ লবণ চাষীরা।

চলতি বছর দেশে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ২৬ লাখ ১০ হাজার টন। গতকাল পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ২১ লাখ ১ হাজার ৬০০ টন। ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর লবণের মৌসুম শুরু হয়, যা ১৬ মে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে। ফলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টন ঘাটতি হতে পারে। প্রতি বছর চাহিদার ভিত্তিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করায় মৌসুম চলাকালে লবণের ঘাটতি দেখা দেয়। কিন্তু বাজারে উদ্বৃত্ত সরবরাহের কারণে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে বিক্রি হচ্ছে ক্রুড লবণ। এতে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন দেশের ৪১ হাজার লবণচাষী। বর্তমানে মণপ্রতি ২০-৩০ টাকা লোকসানের কারণে আগামী মৌসুমে লবণ চাষ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদনে মণপ্রতি ৩৪০-৩৫০ টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু মৌসুমের শুরু থেকেই দাম ছিল মণপ্রতি ১৮০-২০০ টাকা। টানা লোকসানে থাকার পর সরবরাহ কমে যাওয়ায় সম্প্রতি লবণের দাম বাড়তে শুরু করে। তবে মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসেও উৎপাদন খরচ উঠিয়ে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা করতে পারছেন না চাষীরা।

বর্তমানে লবণের দাম কিছুটা বেড়ে মণপ্রতি ৩১০-৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে বড় বড় চাষী কিছুটা লাভ করলেও প্রান্তিক চাষীদের লোকসান হচ্ছে। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় মিল মালিক ও ব্যাপারীদের কাছে লোকসানে লবণ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। চাহিদা ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হলেও বাজারে বাড়তি লবণের জোগান কীভাবে হয়েছে সেই প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ চাষী ও মিল মালিকরা।

লবণ শিল্প উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রধান ও বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ২১ লাখ টনের বেশি লবণ উৎপাদন হয়েছে। মে মাসের শুরুতে বৃষ্টিপাত হওয়ায় উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়। বর্তমানে পুরোদমে উৎপাদন চললেও ১৬ মে আনুষ্ঠানিকভাবে মৌসুম শেষ হবে। সেক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কম হতে পারে।’ তবে মাঠ পর্যায়ে লবণের দাম কম থাকায় চাষীরা কষ্টে রয়েছেন বলে জানান তিনি।

২০২৩-২৪ মৌসুমে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫ লাখ ২৮ হাজার টন। তখন উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৪ হাজার ৮৯০ টন। তবে ওই মৌসুমে লবণ উৎপাদনে রেকর্ড করেছিলেন চাষীরা। মূলত মৌসুমের শুরু ও শেষের দিকে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি বলে জানিয়েছে বিসিক। এবারো লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে বেসরকারিভাবে সোডিয়াম সালফেট (শিল্প খাতে ব্যবহৃত লবণ) ঘোষণা দিয়ে সোডিয়াম ক্লোরাইড (ভোজ্য লবণ) আমদানি করায় বাজারে সরবরাহে ঘাটতি নেই। এ কারণে চাষীরা উৎপাদন করলেও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।

এ প্রসঙ্গে পরিশোধিত লবণ বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান মালেক সল্টের স্বত্বাধিকারী এ খালেক পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে শিল্প লবণের আড়ালে ভোজ্য লবণ আমদানি ও সরবরাহের অভিযোগ নতুন নয়। তবে সরকারি নজরদারির কারণে এ প্রবণতা কমে এসেছে। বিদেশ থেকে লবণ আমদানির সুযোগ কমে আসায় গত দুই সপ্তাহে লবণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’ উৎপাদনে ঘাটতি থাকায় মৌসুম শেষে লবণের বাজার আরো বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে উৎপাদন মৌসুমেই লবণ বিক্রি হয়ে যায়। চাষীদের কাছ থেকে ব্যাপারী, ব্যবসায়ীসহ ছোট-বড় মিল মালিকরা কিনে মজুদ করেন। মৌসুম শেষে সরবরাহ কমে এলে তখন দাম বাড়ে। ফলে চাষীদের কোনো লাভ হয় না। তখন ব্যবসায়ীসহ মিল মালিকরা মুনাফা করেন। অভিযোগ রয়েছে, মিল মালিকসহ শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা বন্ড সুবিধার আড়ালে লবণের মতো পণ্য আমদানি করে ভোজ্য খাতে সরবরাহের কারণে সাধারণ চাষীরা ভুক্তভোগী হচ্ছেন।

বিসিকের তথ্যানুযায়ী, গত মৌসুমে ৬৮ হাজার ৩৫৭ একর জমিতে লবণ চাষ করা হয়। তবে এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ৬৯ হাজার ১৯৮ একর। এছাড়া চাষীর সংখ্যা ৪০ হাজার ৬৯৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪১ হাজার ৩৫৫ জন। দেশে ভোজ্য লবণের পাশাপাশি টেক্সটাইল ও শিল্প খাতে লবণের চাহিদা প্রতি বছরই বাড়ছে।

নাম প্রকাশ না করে চট্টগ্রামের একটি লবণ মিলের স্বত্বাধিকারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বড় মিলার ও বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ সোডিয়াম সালফেট ঘোষণা দিয়ে ভোজ্য লবণ আমদানি করছে। এতে প্রান্তিক চাষীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পাঁচ লাখ টন লবণের ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু বাজারে সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। মূলত আমদানি হওয়া লবণের কারণে চাষীসহ সাধারণ মিলাররা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।’ এ অবস্থায় দেশীয় লবণ উৎপাদন খাতকে সুরক্ষা দিতে আমদানি প্রক্রিয়ায় নজরদারি বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।

আরও